Published On: Sun, May 6th, 2018

কাউন্সিলর প্রার্থীদের টাকার ছড়াছড়ি

গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টাঙ্গাইল সড়ক ধরে কিছুদূর সামনে গেলে দিগন্ত সোয়েটার কারখানা। ইটাহাটা এলাকায় অবস্থিত কারখানাটিতে কাজ করে ২০ হাজারের বেশি কর্মী। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটির অলিগলিতে ঝুলছে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিভিন্ন প্রার্থীর পোস্টার।

সোয়েটারের সামনের চায়ের দোকানে ঢুকে ‘ভোটের হালচাল’ নিয়ে জানতে চাইলে চা বিক্রেতা বলেন, ‘এইডা টাকার খেলার ওয়ার্ড। এহানে টাকা উড়ছে। যে বেশি টাকা দিয়া ভোট কিনতে পারব, জয় তারই।’

বিষয়টি পরিষ্কার করলেন চা পান করতে আসা আলাউদ্দিন মিয়া (৩৫)। বললেন, ‘এ ওয়ার্ডে চার কাউন্সিলর প্রার্থী—বর্তমান কাউন্সিলর খোরশেদ আলম সরকার এবং ফাইজুল আলম দিলীপ, তানভীন সিরাজ ও আমিরুল ইসলাম। তাঁদের মধ্যে আমিরুল ছাড়া বাকি তিনজনই দুই হাতে টাকা উড়াচ্ছেন। সকালে এক প্রার্থী এক হাজার টাকা দিলে, দুপুরে আরেকজন দিচ্ছেন দুই হাজার। রাতে অপর প্রার্থী দিচ্ছেন ওই দুই প্রার্থীর চেয়েও বেশি টাকা। প্রতিদিনই এ অবস্থা চলছে।’

আলাউদ্দিন বলেন, ‘গত নির্বাচনেও এ ওয়ার্ডে টাকার খেলা হয়েছে। এবারও চলছে। গত নির্বাচনে ভোটের আগের রাতে ভোটপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। এবার যে অবস্থা চলছে, তাতে মনে হচ্ছে ভোটের আগের রাতে রেট বেড়ে উঠেবে ১০ হাজারে। যে প্রার্থী বেশি ভোট কিনতে পারবে, জয়ের পাল্লা তার দিকে যাবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ইটাহাটা, কড্ডা ও নাওজোড় এলাকা নিয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড। শিল্প-কারখানা অধ্যুষিত এ ওয়ার্ডের ১৮ হাজার ৬০৬ ভোটারের মধ্যে অর্ধেকেই বহিরাগত শ্রমিক-কর্মী। মূলত তাদের ভোটেই নির্ধারণ হয় জয়-পরাজয়। এ কারণে গত বছরের মতো এবারও শ্রমিক ভোট দখলে নিতে টাকা ওড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সমর্থক, কর্মী ও আত্মীয়রা দল বেঁধে প্রার্থীর হয়ে ভোটারদের ঘরে ঘরে যাচ্ছে। চলছে খানাপিনা, দেওয়া হচ্ছে নগদ টাকা, নানা উপঢৌকন। আলোচনায় থাকায় ওই তিন কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে বর্তমান কাউন্সিলর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম সরকার আওয়ামী লীগের দলীয় সমর্থন পেয়েছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য ফাইজুল আলম দিলীপ। আর তানভীন সিরাজ বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী। এই ওয়ার্ডে একেক প্রার্থীর ব্যয় দুই-আড়াই কোটি টাকা  ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

চান্দনা চৌরাস্তাসংলগ্ন তেলিপাড়া ও টেকনগপাড়া এলাকা নিয়ে নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ড। গতকাল সকাল ১১টার দিকে তেলিপাড়া এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানেও টাকা উড়ছে! স্থানীয় একটি ওয়ার্কশপের শ্রমিক বেলাল মিয়া বলেন, ‘এখানকার ভোটারদের বেশির ভাগই বাইরের জেলার শ্রমিক। তাই শ্রমিকদের ভোট দখল নিয়ে শুরু হয়েছে টাকার লড়াই। ব্যক্তি নয়, এখানে নির্বাচনে টাকাই সব কিছু।’

স্থানীয় একটি ওষুধের দোকানে কথা হয় স্থানীয় টেলিযোগাযোগ স্টাফ কলেজের কর্মকর্তা আসাদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এলাকার উন্নয়ন, সমস্যা বা ব্যক্তি নয়; সেখানে শ্রমিকদের ভোট দিতে হয় প্রার্থীর প্রভাব দেখে। গত নির্বাচনে টাকা ঢেলে বাঘা বাঘা প্রার্থীকে টেক্কা দিয়ে যিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন সেই আওয়ামী লীগ নেতা এবারও প্রার্থী হয়ে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। তাঁর কর্মীরা যেভাবে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, দু-হাতে ভোটারদের টাকা বিলাচ্ছে। তার জন্য অন্য প্রার্থীরা অনেকটাই কোণঠাসা।’ দোকানে ওষুধ নিতে আসা এক নারী শ্রমিক বলেন, ‘টাকা না নিয়ে উপায় আছে? কখন কী বিপদ ঘটে, বলা তো যায় না। ওরা সব পারে।’

এই ওয়ার্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী পাঁচ কাউন্সিলর প্রার্থীর অন্যতম মহানগর কৃষক লীগের সভাপতি আবদুল কাদির। তিনি অভিযোগ করে বলেন, তাঁর প্রতিপক্ষ টাকা দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করছে। দুই হাতে টাকা খরচ করছে। তাঁর সমর্থকদের হুমকি দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

টাকা ছড়ানোর অভিযোগের বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বর্তমান কাউন্সিলর সফর আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁকে হেয় করতে প্রতিপক্ষ এসব ছড়াচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু ১৩ বা ১৮ নয়, নগরীর অর্ধেকের বেশি ওয়ার্ডে টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছেন কাউন্সিলর প্রার্থীরা। এর মধ্যে ২, ৬, ৮, ১০, ১২, ৪০, ৪৩, ৪৭, ৪৯, ৫৪, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের নাম বেশি আলোচিত। আচরণবিধি উপেক্ষা করে প্রার্থীরা একাধিক নির্বাচনী অফিস, পোস্টার, লিফলেট ও মাইক ব্যবহার করছেন। মিছিল-শোডাউন ও শোভাযাত্রা করছেন। নানা বাহানায় ভোটারদের মাঝে টাকা ছড়াচ্ছেন। কর্মী-সমর্থকদের দামি খাবার দিচ্ছেন। নির্বাচনে অনেক প্রার্থীর বাজেট এক থেকে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত।

দুপুরে নগরীর শিল্প অধ্যুষিত ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের বোর্ড বাজারের বাদে কলমেশ্বর, পূর্ব কলমেশ্বর ও কলমেশ্বর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কাউন্সিলর প্রার্থী মশিউর রহমান মশির পোস্টারে ছেয়ে গেছে এলাকা। কলমেশ্বর সড়কের একটি লাইব্রেরিতে কথা হয় ব্যবসায়ী ফয়সাল আলমের সঙ্গে। জানালেন, এ ওয়ার্ডে প্রার্থী চারজন। এর মধ্যে সব দিক থেকেই নির্বাচনে এগিয়ে আছেন বর্তমান কাউন্সিলর আবদুল্লাহ আল মামুন মণ্ডল। তাঁর তিন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মশিউর রহমান মশি, মোহাম্মদ নুরুল আলম দুই হাতে টাকা খরচ করছেন বলে ওই ব্যবসায়ীর দাবি।

টাকা ছড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ খাইলকুরেও। ওই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন বর্তমান কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা জিল্লুর রহমান মুকুল। তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে প্রার্থী হয়েছেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির। শ্রমিক অধ্যুষিত এ ওয়ার্ডের ভোটার ২২ হাজার ৪৩।

ওয়ার্ডের জয় বাংলা সড়কের বাসিন্দা আলমাছ বেপারী বলেন, ‘ভোটারদের তিন ভাগের দুই ভাগই বহিরাগত শ্রমিক। মনির কাউন্সিলর হতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। বাধ্য হয়ে পদ ধরে রাখতে মুকুলও চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কাউন্সিলরের পদ দখল ও ধরে রাখতে গিয়ে এ দুই প্রার্থী মেতে উঠেছেন টাকার খেলায়।’

টঙ্গী এলাকায় গেলে স্থানীয়রা জানায়, সাবেক টঙ্গী পৌরসভা এলাকায় ওয়ার্ড রয়েছে ১৫টি। এর মধ্যে কমপক্ষে ১০টিতে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে টাকার বিনিময়ে। টঙ্গীতে বস্তি রয়েছে ১৯টি। এসব বস্তির ভোটারদের আয়ত্তে রাখতে এবং সাধারণ ভোটারদের নানাভাবে আকৃষ্ট করতে শুরু হয়েছে টাকার খেলা। এসব ওয়ার্ডের কোনো কোনোটির ব্যয় তিন কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা স্থানীয় বাসিন্দাদের।

টঙ্গীর অভিজাত এলাকার একটি ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের আউটপাড়া। এ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী চারজন। গত নির্বাচনে সাবেক কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা নাসির উদ্দিন মোল্লাকে হারিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি নেতা শেখ মোহাম্মদ আলেক। এবার আওয়ামী লীগ থেকে সমর্থন পেয়েছেন হেলাল উদ্দিন। তিনি ও নাসির মোল্লা দুজনই ধনকুবের। অভিযোগ উঠেছে, বিজয়ী হতে ওই দুই প্রার্থী টাকা বিলাচ্ছেন।

টাকা উড়ছে টঙ্গীর ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডেও। এখানে প্রার্থী পাঁচজন হলেও কঠিন লড়াইয়ে নেমেছেন আওয়ামী লীগের দুই নেতা। তাঁরা হলেন বর্তমান কাউন্সিলর আবুল হোসেন ও শাহ আলম। আবুল হোসেন টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগ এবং শাহ আলম মহানগর তাঁতি লীগ নেতা। বিজয়ী হতে দুজনই প্রচুর ব্যয় করে চলেছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) গাজীপুর জেলা সভাপতি অধ্যাপক মুকুল কুমার মল্লিক প্রার্থীদের অতিরিক্ত টাকা ব্যয় প্রসঙ্গে বলেন, ‘ভোট কেনাবেচা বন্ধ না করা গেলে বা কালো টাকার প্রভাব বন্ধ না করা গেলে নির্বাচন অর্থবহ হয় না। নির্বাচন কমিশনের এ ব্যাপারে দায়িত্ব রয়েছে। তারা কঠোর নজরদারি ও পদক্ষেপ না নিলে নির্বাচনে টাকার প্রভাব বাড়তেই থাকবে। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার মো. তারিফুজ্জামান জানান, ভোটার অনুযায়ী একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটারসংখ্যা ১৫ হাজার পর্যন্ত প্রার্থীর ব্যক্তিগত ব্যয় ২০ হাজার ও নির্বাচনী ব্যয় এক লাখ টাকা। ভোটার ২০ হাজার পর্যন্ত নির্বাচনী ব্যয় দুই লাখ এবং ভোটার ৩০ হাজারের বেশি হলে নির্বাচনী ব্যয় তিন লাখ টাকা। এর চেয়ে বেশি কোনোভাবেই খরচ করা যাবে না।

তারিফুজ্জামান বলেন, ‘অতিরিক্ত খরচের অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তা ছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করছে। তারাও বিষয়টি নজর রাখছে। ভোট কেনাবেচার বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

Facebook Comments

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>